বাঙালীর উৎসব ৷৷
কাণ্ডারী পত্রিকা শারদীয়া সংখ্যা'2014 তে প্রকাশিত৷
পশ্চিমবঙ্গে যে সকল উৎসব পালন করা হয়, তা মোটামুটি পাঁচ ধরণের হয়৷ (১) জাতীয় উৎসবগুলির মধ্যে প্রজাতন্ত্র দিবস, রবীন্দ্রজয়ন্তী, স্বাধীনতা দিবস ইত্যাদি৷ এগুলো সারা দেশ জুড়ে পালিত হয়৷(২)ধর্মীয় উৎসবগুলির মধ্যে কালীপূজা, সরস্বতী পূজা, ঈদ্, মহরম মহাসমারোহে পালিত হয়৷ কিছু(৩)লৌকিক উৎসব আছে বাঙলায় সেটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভীষণভাবে জনপ্রিয়৷ যেমন -চড়ক উৎসব, সত্যনারায়ণ পূজা, গাজন উৎসব, শীতলা উৎসব৷ এছাড়াও (৪) পারিবারিক উৎসবগুলির মধ্যে রয়েছে ভাতৃদ্বিতীয়া, জামাইষষ্ঠী, জন্মদিন পালন, উপনয়ন, বিবাহ৷ আর ৫৷ সামাজিক উৎসবগুলি হলো নবান্ন, বসন্তোৎসব, শারদোৎসব ইত্যাদি৷
সময়ের সাথে বদলেছে মানুষ, বদলেছে তার রুচিবোধ৷ আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে যে উৎসবগুলো মানুষ ভক্তিভরে পালন করত, এখন সেই উৎসবগুলো তেমন ভাবে পালন হয় না৷ গ্রামকে কেন্দ্র করে যে উৎসবগুলি হত সেগুলি ক্রমে বিলুপ্ত হতে চলেছে৷ তাই এমন কয়েকটি উৎসব সম্বন্ধে আজ আলোচনা করব যেগুলো আমাদের সমাজ থেকে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে৷
নবান্ন উৎসব
বাঙালী যা খেয়ে জীবনধারণ করে,তা হল অন্ন৷ আর চাষ করার পর নতুন চালে অন্ন রেঁধে যে উৎসব পালন করা হয় তা হল নবান্ন উৎসব৷ বাংলার কৃষিজীবি সমাজের শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব আচার-অনুষ্ঠান , উৎসব পালিত হয় , নবান্ন তার মধ্যে অন্যতম৷ নবান্ন মানে নতুন অন্ন, নতুন ফসল ঘরে তোলা উপলক্ষ্যে কৃষক এই উৎসব পালন করে থাকে৷ সাধারণত, নবান্ন হয়ে থাকে অগ্রহায়ণ মাসে ৷ এ সময় আমন ধান কাটা হয়৷ এই নতুন ধানের চাল নিয়ে রান্না উপলক্ষ্যে এই উৎসব৷ গবেষকদের মতে, কৃষিপ্রথা চালু হওয়ার পর থেকেই নবান্ন উৎসব পালন হয়ে আসছে৷
বাঙালীর নবান্ন উৎসবের মধ্যে রয়েছে বিনোদন ও প্রীতিবন্ধনের আনন্দ৷ নতুন ধান উঠলে শুধু পিঠা, পায়েস, ক্ষীর নয়, ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে কাঁচা আতপ ধানের চিড়া, সিদ্ধ ধানের খই, নতুন চালের মুড়ি ভেজে আঁচলে বা গামছায় মুড়ে খাওয়া হয়৷ আর প্রতিবেশী , বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে ছিল আনন্দের প্রকাশ৷ এছাড়াও নবান্ন উপলক্ষ্যে গ্রামে খেলাধূলা ও গানবাজনার আয়োজন করা হত৷ নবান্নের পূর্বে গ্রামীন মহিলারা বাড়ির উঠানে আলপনা আঁকতেন, ঘর লেপা দিতেন(মাটির বাড়ি)৷ এ সংস্কৃতি অতীতে হিন্দু-মুসলিমের প্রায় প্রত্যেক ঘরে ঘরে উৎসব আকারে পালিত হত৷ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতির সাথেই এর সম্পর্ক রয়েছে৷ তাই নতুন চালের পিঠা, পায়েস, ক্ষীর, তৈরী করে নিজেরা খাওয়ার পূর্বে কেউ ইষ্টদেবতা, কেউ পীর ফকিরের উদ্দেশ্যে নিবেদন শেষে আনন্দ সহকারে বাড়ির সকলে মিলে নতুন ধানের অন্ন বা খাদ্যের স্বাদগ্রহণ করে থাকে৷ হিন্দু শাস্ত্রে নবান্নের উল্লেখ ও কর্তব্য নির্দিষ্ট করা রয়েছে৷ হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে , নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃপুরুষ অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন৷ এই কারণে হিন্দুরা পার্বণবিধি অনুযায়ী নবান্নে শ্রদ্ধানুষ্ঠান করে থাকেন৷ শাস্ত্রমতে, নবান্নে শ্রদ্ধানুষ্টান না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়৷
এ রীতিতে, নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্ন পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাক, ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করেন ও আত্মীয়-স্বজন কে পরিবেশন করার পর গৃহকর্তা পরিবারবর্গ নতুন গুড় সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন৷ নতুন চালের তৈরী খাদ্যসামগ্রী কাককে নিবেদন করা নবান্নের একটি বিশেষ লৌকিক প্রথা৷ লোকবিশ্বাসানুযায়ী , কাকের মাধ্যমে ঐ খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়৷ এই নৈবেদ্যকে বলে 'কাকবলি'৷ এতে একটি কলার ডোঙায় নতুন চাল, কলা , নারকেল নাড়ু কাককে খাওয়াতে হ়য়৷
এছাড়া কাকবলীর আগে তিনটি লৌকিকতা সম্পন্ন করা হত৷ লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ, বীরবাশ৷ বীরবাশের নিয়ম হচ্ছে, বাড়ির উঠানের মাঝখানে একটি গর্ত করা হয়৷ তার চারপাশে পীটুলি দিয়ে আলপনা আঁকা হয়৷ গর্তে জ্যান্ত কইমাছ ও কিছু দুধ দিয়ে একটা বাঁশ পোঁতা হয়৷ সেই বাঁশের প্রতিটি কঞ্চিতে ধানের ছড়া বাঁধতে হয়৷ নবান্ন উৎসবে কাকবলি, লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ হয়ে গেলে সবাই একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করতেন৷ এর আগে কেউ কিছু খেতেন না৷
সবাই একসঙ্গে খেতেন ও উলুধ্বনি করতেন৷ এখানেই শেষ হত না, সাধ্যমত এই উৎসব উপলক্ষ্যে প্রায় ২০-৪০টি পদের রান্না হত৷ বিভিন্ন রকমের শাক রান্না করা হত৷ দুপুরের নবান্ন অন্যের বাড়িতে করলেও রাতের নবান্ন সবাই নিজের বাড়িতে করতেন৷ নবান্নের পরের দিনেও নবান্নের রেশ থাকত, সেটাকে বলা হত 'বাসি নবান্ন'৷
প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় নবান্ন শুধু বাঙালী জাতিটা পালন করে না৷ দক্ষিণভারতে একই কারণে পোঙ্গল ও ওনাম উৎসব পালিত হয়; পাঞ্জাবে লহরী পালিত হয়৷ ভারত ছাড়া আরো অনেক দেশে ফসল তোলাকে কেন্দ্র করে উৎসব করে৷ জাতিভেদে , রীতিনীতির ফারাক থাকলেও আসল উৎসবটাই একই৷ যেমন চীনের উৎসবকে বলা হয় মুন ফেস্টিভ্যাল, আফ্রিকায় ইয়াম, ভিয়েতনামে তেত্ ত্রাং দু ও আমেরিকায় থ্যাংকস গিভিং ডে বলা হয়৷
দিন বদলের পালা আর নাগরিকায়নের প্রভাবে আমাদের আচারানুষ্ঠান থেকে এ প্রথা সংকীর্ণ হয়ে আসছে৷ এখন আর এত আড়ম্বড়ে পালন হয় না এই উৎসব৷ চাষীদের সংখ্যাও কমছে৷ বর্তমানে এই প্রজন্মের কাছে নবান্ন মানে বাংলা পরীক্ষার আগের দিন ব্যকরণে পড়ে যাওয়া 'নব যুক্ত অন্ন=নবান্ন' ব্যস্ এইটুকুই৷ যে খাদ্যের উপর নির্ভর করে আমরা বেঁচে আছি সেই খাদ্য নিয়ে উৎসব পালন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে প্রতিটা বাঙালীর অবগত থাকা দরকার৷
যোগাযোগ করুন আমার সাথে -Sardarji On facebook
পিঠা পুলির উৎসব
পিঠা, এ শব্দটা শুনলেই জিভে জল এসে যায়৷ মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা৷ শীত আসতে না আসতেই ধুম্ পড়ে যায় গ্রামে গঞ্জের বাড়িতে বাড়িতে মনকাড়া নানা ধরণের ও নানা স্বাদের পিঠা তৈরীর আয়োজনে৷ আশে-পাশের বাড়ির পিঠার মৌ মৌ গন্ধে হৃদয় নেচে ওঠে৷ পিঠা যে কত রকমের হয় তা গুণে বলা মুশকিল৷
সেই আদ্যিকাল থেকেই হেমন্ত ঋতুতে বাংলার কৃষকের বাড়ি ঘর নতুন ফসলের গন্ধে ভরে যায়৷ আয়োজন করা হয় পিঠা উৎসবের৷ এই পিঠা খাওয়ার ধুম চলতে থাকে সারা শীতকাল জুড়ে৷ এখন আর সে জোয়ার নেই৷ এই পিঠা উৎসব পশ্চিম ও পূর্ববাংলার সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ৷ আজ ও গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে যেকোনো উৎসবে আনন্দের সাথে মিশে আছে রকমারী পিঠা পরিবেশনের আয়োজন৷
শীতকালে মৌসুমী পিঠার কদর সবচাইতে বেশি৷ এ সময় খেঁজুরের রস, খেঁজুর ও আখের গুড় পাওয়া যায়, যা দিয়ে তৈরী হয় সুস্বাদু পিঠা৷ উপাদেয় হিসাবেই বেশিরভাগ পিঠাই মিষ্টি জাতীয়৷ তবে টক-ঝাল পিঠাও আছে৷ এর সাধারণ উপাদান চালের গুঁড়া, ময়দা, গুড় বা চিনি, নারকেল ও তেল প্রভৃতি৷ অনেকসময় কিছু কিছু পিঠা তৈরীতে মাংস, সবজি বা তাল, কলা ইত্যাদি ফল ব্যবহৃত হয় এবং সে অনুযায়ী পিঠার নামকরণ করা হয়৷ যেমন-সবজিপুলি, সবজি ভাঁপা, মাংস পাটিসাপটা ইত্যাদি৷ ভারতে ও বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ ও জনপ্রিয় পিঠাগুলির মধ্যে রয়েছে চিতই পিঠা, দুধ চিতই, পাটিসাপটা, গোকুল পিঠা, চাপড়ি পিঠা, বিবিয়ানা, জোড় কলই পিঠা, ক্ষীরপুলি৷ বিবিয়ানা পিঠাকে জামাই ভোলোনো পিঠা বলা হয়৷ কারণ কারুকার্য খচিত এই পিঠা তৈরীতে কনে কে অনেক পারদর্শিতার পরিচয় দিতে হয়৷
ইউরোপ, আমেরিকার ও বিশ্বের অন্যান্য কিছু দেশের কয়েকটি খাবারকে পিঠা হিসাবে চিহ্নিত করা গেলেও তা ভারতের মত না৷ ঐ পিঠাগুলির তৈরীর প্রক্রিয়া ও খাওয়ার রেওয়াজেরও পার্থক্য রয়েছে৷ পিঠা খাওয়ার এই প্রচলন নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশগুলিতে রয়েছে৷ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, আসাম, বিহার,ওড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড ও উত্তরপূর্ব এলাকাগুলিতে পিঠার প্রচলন বেশি৷ আসামের বিহু উৎসব হয় মূলত পিঠাকে কেন্দ্র করে৷ পশ্চিমবঙ্গের আরো কয়েকটি জনপ্রিয় পিঠা হল- তাল পিঠা, তেকেলি পিঠা, তিলের পিঠা, নারকেল পিঠা, গোলাপফুল পিঠা ইত্যাদি৷
পিঠা মানুষের জীবনে স্বাদের ভিন্নতার মধ্য দিয়ে এনে দেয় এক পরিতৃপ্তির আনন্দ৷ এনে দেয় প্রশান্তির আমেজ৷ আগেকার দিনে বিয়ে বা অন্য কোনো উৎসবে খাবারের একটি অংশ হিসাবে থাকত নানা স্বাদের রকমারী পিঠা৷
বর্তমানে তারা আর নেই বললে চলে৷ বিদেশি খাবারের প্রাচুর্য্যের কারণে নতুন প্রজন্মের শহুরে নাগরিকরা অনেকেই অনেক পিঠা চেনে না বা এর আসল স্বাদ পায় না৷ তবে একথা বলতে হয় পিঠার ঐতিহ্য আজও টিঁকে আছে এবং শহরেও বাঙালীরা তার কিছু আয়োজন করে থাকে৷ এক্ষেত্রে শহরে আশ্রয় নেওয়া গ্রামের দরিদ্র মানুষেরাই একে টিঁকিয়ে রেখেছে৷ দেখা যায় তারা শহরের মোড়ে মোড়ে চালের গুঁড়া আর রসের গুড় নিয়ে শহরবাসীকে পিঠার স্বাদ নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে৷ একেই বলে "এতই ভঙ্গ বঙ্গদেশ, তবু রঙ্গে ভরা৷ "
তথ্য সাহায্যে-- I.I.N, Wikipedia, Webradio, Orthoniti Protidin.










darun hyeche
ReplyDeletethank you
ReplyDeletesatti khub valo hoyeche..
ReplyDeletethank you so much ... (y)
Deletenice..........
ReplyDeleteThanks bro... (y)
Deleteসাধারণ কে অসাধারন উপস্থাপনা
ReplyDeleteThank you so much... ♥♥♥
ReplyDelete