Saturday, May 21, 2016

ধন্বন্তরী কালীমাতা ও মহা বেশ-Dhanwantari Kalimata and Maha Besh

জয়নগর ধন্বন্তরী ও বেশ -এর মেলা-Dhanwantari Kali 



 দক্ষিণ ২৪ পরগণার জয়নগর-মজিলপুর একটি ঐতিহ্যমন্ডিত স্থান৷ এই পৌর-শহরের কোনে কোনে রয়েছে ইতিহাসের ছোঁয়া৷ ৩৬৫দিনে ৩৬৬ পার্বণ এখানে৷ জয়নগর-মজিলপুরের জনপ্রিয় উৎসব গুলির মধ্যে অন্যতম হল ধন্বন্তরী মায়ের রূপ পরিবর্তন উৎসব৷ এটি জয়নগরের সবথেকে বড় মেলা৷ টানা ১৫ দিন চলা এই মেলায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিদিন গড়ে  ৩০/৩৫ হাজার মানুষ আসেন৷

ধন্বন্তরী কালীমাতা মন্দির


মেলার ইতিহাস
মেলার ইতিহাস বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় ধন্বন্তরী কালী মন্দির এর কথা৷ এই কালী বিগ্রহ কে কেন্দ্র করে এক পক্ষকালব্যাপী এই মেলা হয়৷ এই কালী মন্দির প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে এক কথিত গল্প- আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের কথা৷ তখন আদিগঙ্গার পূর্ব তীর ছিল জঙ্গলাকীর্ণ শ্মশান৷ তান্ত্রিক ব্রাম্ভন  ভৈরাবনান্দ গোস্বামী এই জনবিরল স্থানে তন্ত্র সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন৷ তিনি একদিন রাতে স্বপ্নাদেশ পেয়ে বর্তমান মন্দিরের পশ্চিম দিকের পুকুর থেকে  একটি প্রস্তরময় কালীমূর্তি ও  মহাকাল মূর্তি উদ্ধার করে কালীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন৷ ভৈরাবানন্দ তাঁর যোগ্য শিষ্য রাজেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে এই বিগ্রহের দায়িত্ব দিয়ে এই স্থান ত্যাগ করেন৷

মন্দির দালান
রাজেন্দ্রপ্রসাদ বর্তমান বাংলাদেশের যশোহরের বিক্রমপুর থেকে মজিলপুরে এসেছিলেন৷ তিনি এই প্রস্তরমূর্তির সাথে দারু নির্মিত মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে দেবীর পূজার্চ্চনা ও সেবাদি করতেন৷ পরবর্তী কালে কালী প্রতিমার মন্দির নির্মাণ হয়৷ তারপর ক্রমে মন্দিরের চাঁদনী , শনি ঠাকুরের পৃথক মন্দির, শিবমন্দির, পূজারীদের থাকার জায়গা, অফিস যাত্রীনিবাস নির্মান হয়৷


কমলে কামিনী রূপ


ধন্বন্তরী নাম হল কেন? 
মা কালীর মহিমা বহূদূর পর্যন্ত প্রচলিত৷ কয়েক শ' বছর ধরে জাগ্রত দেবী হিসাবে বিরাজ করছেন তিনি৷ এই কালীবাড়ি থেকে স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত বাত ও অম্লের ওষুধ দেওয়া হয়৷ কথিত আছে এই ওষুধ অব্যর্থ এবং দেববৈদ্য  ধন্বন্তরী প্রদত্ত৷ তাই থেকে এই বিগ্রহের নাম হয় ধন্বন্তরী কালীবাড়ি৷ প্রতিনিয়ত এখানে ভক্ত সমাগম হয়৷ প্রতি শনিবার শনিঠাকুরের পূজা হয় এখানে৷ শ্রাবণ মাসের চারটি শনিবার লোকারণ্য হয়ে থাকে মন্দির প্রাঙ্গণ৷ বিপত্তারিণী চন্ডীর পূজা হয় মহাড়ম্বরে৷ স্থানীয় স্বর্গীয় রাজেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর পরিবার বংশপরম্পরায় এই বিগ্রহের সেবায়েৎ হিসাবে রয়েছেন৷
মন্দির সংলগ্ন শনি বিগ্রহ

 মায়ের রূপ পরিবর্তন উৎসব - মহা বেশ 
প্রতি বছর বৈশাখ মাসে এই কালী বিগ্রহ কে কেন্দ্র করে একপক্ষ সময় ব্যাপী বিশাল মেলা বসে৷ শুক্লা প্রতিপদ থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত, প্রতিদিন দেবীকে ভিন্ন ভিন্ন  রূপে  উপস্থাপনা করা হয়৷ এই দিনগুলিতে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ হাজার মানুষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দেবীর রূপ ও মেলা দর্শন করেন৷ 'রূপ' অর্থে মায়ের 'বেশ' পরিবর্তন করা হয় বলে একে বেশ-এর মেলা বলা হয়৷


রূপ পরিবর্তনের তালিকা








 সন্ধ্যে থেকে রাত ১ টা পর্যন্ত মেলা চলতে থাকে৷ প্রচুর ভিন্ন প্রকার দোকান ও রাইডে ভরে যায় মন্দির এর বহূদূর সীমানা পর্যন্ত৷ বাচ্চাদের খেলনা থেকে শুরু করে, মেয়েদের সাজ সরঞ্জাম, হেঁসেলের জিনিস, ঘর সাজানো, শাঁখা-পলা, শৌখিন দ্রব্য, ঠাকুরের মূর্তি, মাটির পুতুল,  কাস্তে, শিকল, হাতুড়ি, আচার, ম্যাজিক, ঝাঁটা-ঝাড়ু ইত্যাদি নানা রকম দ্রব্যের দোকান বসে৷

মন্দির চাঁদনী

মন্দির
 খাওয়ার দোকান ও পাল্লা দিয়ে বসে এই দোকানগুলোর সাথে৷ ফুচকা, ঘুঘনির পাশা পাশি কন্টিনেন্টাল ও চাইনিজ খাবারের রেস্টুরেন্ট গুলোতে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও রুচিসম্মত খাবার পরিবেশন করা হয়৷ আচার, চাটনী, জিলিপি, চপ সব রকম  মুখোরোচক খাবার পাওয়া যায়৷


রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে দোকান আসে

 ব্রেক ড্যান্স, জায়েন্ট হিল , টয় ট্রেন ও আরো নানা শিহরণ জাগানো রাইড উপস্থিত হয়৷ দেখার মধ্যে রয়েছে 3D শো, বাইক ও কার স্টান্ট, ম্যাজিক , সংরক্ষিত বস্তু, অতিমানব ও বিষ্ময়কর নানা জিনিস৷

ব্রেক ড্যান্স
ধন্বন্তরী মায়ের রূপ পরিবর্তন মেলা জয়নগরের সবথেকে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ মেলা৷ মেলার দিনগুলিতে বহূদূর থেকে দর্শনার্থী আসেন৷ জয়নগরের ঐতিহ্যবাহী গৌরবের সাথে জড়িয়ে রয়েছে এই ধন্বন্তরী কালী মন্দির৷ দঃ ২৪ পরগণার অনেক মানুষ জয়নগরকে মনে রাখেন এই ধন্বন্তরী কালীমাতা ও বেশ এর মেলার জন্য৷ সময়ের সাথে এই মেলার স্ফীতি বেড়ে চলেছে প্রতিবছর৷ লিখিতভাবে ১৫ দিন রূপ পরিবর্তন হলেও এই মেলা টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে৷ জয়নগরের ধন্বন্তরী কালীমাতার এই রূপ পরিবর্তন উৎসব  ক্রমে  মহামেলায়  পরিণত হয়েছে৷




মায়ের ষোড়শী রূপ




লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ৷ আগের লেখাগুলো পড়ার জন্যে হোম এ ক্লিক করুন৷ আর কমেন্ট এ মতামত জানাতে ভুলবেন না৷ 

♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥আরও পড়ুন♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥









6 comments:

  1. খুব সুন্দর হয়েছে রিপোর্টিং টি। এগিয়ে চলো, সঙ্গে আছি।

    ReplyDelete
  2. ধন্যবাদ৷ ভালো লাগলে দয়া করে শেয়ার করবেন৷

    ReplyDelete
  3. Nice to read the historic story

    ReplyDelete
  4. Thanks.. plz share this...story..

    ReplyDelete
  5. রাজেন্দ্র চক্রবর্তীর বংশধরেরা মন্দিরের সেবাইত নয়। চক্রবর্তীদের পারিবারিক মন্দির হিসেবেই দেখা হয়। সেবাইত হল মন্দিরের পেছনে থাকা এক ঘর মুখারজ্জিরা। যাই হোক মন্দিরের একটা অন্য ইতিহাসও আছে। মন্দিরটি মুলনিবাসিদের, আর ব্রাম্ভনরা সেটা পরবর্তীকালে দখল করেছে। এটা প্রস্তর মূর্তি, বা বাদ্য যন্ত্র হিসেবে দামামা দিয়ে বোঝা যায়।

    ReplyDelete